পাকিস্তানে বড় ধরনের বিনিয়োগ চীনের

0

পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের উপকূলীয় ছোট্ট শহর গাদারের বাসিন্দাদের মন জয়ের পাশাপাশি সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে চীন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সন্দেহ ভবিষ্যতে বন্দরটিকে চীনা নৌবাহিনীর কাজে লাগানো হবে। পাকিস্তানের বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন। বিশেষ করে বেলুচিস্তানের গাদারে ব্যাপকভিত্তিক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে দেশটি। আর এতে অস্বস্তিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। তাদের ধারণা এভাবে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ধারাবাহিকতায় একসময় পাকিস্তানে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলবে বেইজিং। আর এমন ধারণা যদি বাস্তব রূপ নেয় তাহলে সেটা একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে এ অঞ্চলে বেকায়দায় ফেলে দেবে। এ বছরই দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা মালিকানাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে মার্কিন ডেস্ট্রয়ার। অন্যদিকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সম্ভাব্য সাবমেরিন হামলা মোকাবিলায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে ভারতীয় নৌবাহিনী। এমন বাস্তবতায় এ অঞ্চলে চীনা নৌবাহিনীর অবস্থানের বিষয়টি বাস্তব রূপ পেলে সেটা নিঃসন্দেহে ওয়াশিংটন ও দিল্লির জন্য এক ধরনের অশনি সংকেত। আরব সাগরের পাশে বিশ্বের ব্যস্ততম তেল ও গ্যাস পরিবহন রুটের পাশে গাদার বন্দরটির অবস্থান। চীন সেখানে স্কুল নির্মাণ, চিকিৎসক পাঠানোসহ প্রায় ৫০ কোটি ডলার ব্যয়ে বিমানবন্দর, হাসপাতাল, কলেজ ও অতি প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নির্মাণ করতে যাচ্ছে। গবেষক ও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলছেন, এসব অনুদানের মধ্যে একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে যা দেশের বাইরে চীনের সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি। গাদার প্রকল্পটি অন্যান্য দেশের প্রতি চীনের দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে আলাদা। চীন পশ্চিমা দেশগুলোর মতো অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তার বদলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো থেকে সরাসরি ঋণ দিতো। এ প্রসঙ্গে চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের ওপর একটি বইয়ের লেখক ও ওয়াশিংটনভিত্তিক জার্মান মার্শাল ফান্ডের গবেষক অ্যান্ড্রু স্মল বলেন, ‘চীনের এমন অনুদানের নিবিষ্টতা বেশ আকর্ষণীয়। চীন সাধারণত সহায়তা বা অনুদান দেয় না। তাই তারা যখন এমন করে বুঝতে হবে তারা পরিণত হচ্ছে।’ পাকিস্তান এই সহায়তাকে খোলাখুলিভাবে স্বাগত জানিয়েছে। তবে চীনের এমন অস্বাভাবিক সহায়তার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। মার্কিন নৌ-আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে গাদারকে চীনের ভবিষ্যৎ ভূ-কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভাবছে তারা। এ ব্যাপারে জানতে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের কেন্দ্র হিসেবে গাদারকে দেখছে দুই দেশ। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ পরিকল্পনায় এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার ৬০টির বেশি দেশের স্থল ও সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক ‘সিল্ক রোড’র গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে গাদার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাদারের পাশেই বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। সেখান থেকে শিল্প সামগ্রী বিশ্বব্যাপী রফতানির সুযোগ তৈরি হবে। চীনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে গাদার পর্যন্ত জ¦ালানি পাইপলাইন, সড়ক ও রেল যোগাযোগও স্থাপন করা হবে। আর ২০২২ সালের মধ্যে বন্দরটির সক্ষমতা ১২ লাখ টন থেকে  বাড়িয়ে এক কোটি ৩০ লাখ টন করা হবে। এজন্য আগামি বছর বন্দরের পাঁচটি বার্থ খনন করে গভীরতা ২০ মিটার পর্যন্ত বাড়ানো হবে। গাদারে চীনের জন্য বেশকিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। সুপেয় পানির অভাব, বিদ্যুতের অপ্রতুলতার পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের হুমকিও রয়েছে সেখানে। বিদ্রোহীরা গাদারসহ বেলুচিস্তানের অন্যান্য চীনা প্রকল্পে হামলার হুমকি দিয়ে রেখেছে। এ কারণে সেখানে চীনা নাগরিকসহ বিদেশিদের সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হয়। তবে চীন সাধারণ নাগরিকদের আস্থা অর্জনের জন্য নানা চেষ্টা করলেও অবস্থার খুব পরিবর্তন হচ্ছে না। বিছিন্নতাবাদীদের অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে স্থানীয় আইনপ্রণেতা ইসার নোরি বলেন, ‘স্থানীয় জনগণ পুরোপুরিভাবে সন্তুষ্ট নয়।’ পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে খ্বু শিগগিরই পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে জানিয়ে বাসিন্দাদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে। গাদারকে অবশ্য অনেকেই শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের সঙ্গে তুলনা করতে চাইছেন। হাম্বানটোটা গ্রামটিকে বন্দরে রুপান্তরিত করা হলেও দেনার দায়ে তা চীনের কাছে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দিতে বাধ্য হয় শ্রীলঙ্কা। একে অনেক শ্রীলঙ্কানই তাদের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। হাম্বানটোটাও চীনের মেগা প্রকল্প বেল্ট অ্যান্ড রোডের অংশ। তবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এমন আশঙ্কা নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, হাম্বানটোটার চেয়ে এখানে অনেক কম ঋণ নেওয়া হচ্ছে। গাদারে বিনিয়োগের সুফল হিসেবে আগামি ৪০ বছর বন্দরের ৯১ শতাংশ শুল্ক আদায় করবে চীন। আর তাদের বিদেশি বন্দর পরিচালনা প্রতিষ্ঠানটিও ২০ বছরের জন্য বড় ধরনের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। পাকিস্তানের সমুদ্র বিষয়ক মন্ত্রী হাসিল বিজেঞ্জো বলেন, পারস্য উপসাগরে একসময় যুক্তরাজ্য ও রাশিয়া এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তিনি  বলেন, ‘চীন খুব সহজে এখানে পৌঁছেছে। এই উষ্ণ পানির সমুদ্রে প্রবেশাধিকারের সুবিধার তুলনায় তাদের বিনিয়োগ কিছুই নয়।’ গাদারে চীনের সামরিক ঘাঁটি হতে পারে বলে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়। ভারতও একই আশঙ্কা প্রকাশ করলে চীন তা প্রত্যাখ্যান করে। সে সময় চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী উ সিয়ান বলেন, ‘পাকিস্তানে চীনের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টি নিছক অনুমান ছাড়া আর কিছুই নয়।’ সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি।

Share.

Leave A Reply