ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কঠোর হতে হবে

0

ব্যাংক পরিচালনায় অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, অনিয়ম-দুর্নীতি, মন্দঋণ বৃদ্ধি- সব মিলিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে ব্যাংকিং খাতে। যা দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের অধিকাংশই নিয়োগ হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। সরকারি ব্যাংকগুলোতে এমন নিয়োগের হার প্রায় শতভাগ। অভিযোগ রয়েছে, শীর্ষ আমলা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে এসব ব্যক্তি শীর্ষ নির্বাহী পদে নিয়োগটি বাগিয়ে নিচ্ছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে বারবার। ব্যাংকে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন যদি সঠিকভাবে না হয়, তাহলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন আশা করা যায় না।

জানা গেছে, সরকারি ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। এ ক্ষেত্রে সৎ, যোগ্য ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে মন্ত্রণালয়। অথচ দেখা যায়, রাজনৈতিকভাবেই এসব পদে পরিবর্তন আসে। শুক্রবারের একটি জাতীয় দৈনিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, দি সিটি ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংকে দলীয় বিবেচনায় এমডি এবং সিইও কর্মরত। এ ছাড়া চট্টগ্রামের একটি শিল্প গ্রুপের অধীনে প্রায় ৭টি বেসরকারি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এসব ব্যাংকের মালিকানা বদলের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরও পরিবর্তন ঘটে। বেসরকারি খাতের অন্তত ১৫টির মতো ব্যাংক রয়েছে যাদের মালিকানায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি সমর্থিত ব্যবসায়ীরা রয়েছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রাজনৈতিক প্রভাব তো রয়েছেই, এ ছাড়া কোটি কোটি টাকা ছাড়া এমডি নিয়োগ হয় না। এসব এমডির পেছনে যারা টাকা ব্যয় করে তারা মূলত কোটি কোটি টাকার ঋণখেলাপি। সরকারি ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক দলের নেতারা আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ব্যাংকের পরিচালকরা অনেক সময় প্রভাব বিস্তার করে ঋণ অনুমোদন করে। অনেক সময় যথাযথ প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান না করে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান করা হয়। এসব ঋণ সময়ের ব্যবধানে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, অনিয়ন্ত্রিত খেলাপি ঋণ ও খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণেই মূলত ব্যাংকিং খাতে এমন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। খাতটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়েছে। খেলাপি ঋণ আদায় ও ঋণ বিতরণে অনিয়ম বন্ধ করতে রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি পাঁচ ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও দি ফারমার্স ব্যাংক। এই তিনটি ব্যাংকের মধ্যে ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো খুবই জরুরি ছিল সন্দেহ নেই। এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন হয়েছে নতুন কোনো খবর আমাদের কাছে নেই। আমরা মনে করি, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনার বড় চ্যালেঞ্জ এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা সরকারের সামনে। শক্ত হাতে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। তেলা মাথায় তেল দেয়ার নীতি পরিহার করে ব্যাংকিং খাত যতদিন না শক্ত হাতে ঋণ আদায়ে এগোবে, ততদিন খেলাপি সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হবে না। এজন্য সর্বপ্রথম ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দ্রুতই আর্থিক খাতের বিদ্যমান অবস্থার উন্নতি না ঘটলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় আইন, গাইডলাইন এবং নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

Share.

Leave A Reply