স্বরূপে সৌম্য সরকার

0

এফএনএস স্পোর্টস: তার ব্যাটিংয়ের মূল মন্ত্র, ভয়ডরহীন মানসিকতা। কিন্তু এই মন্ত্রেই আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন। মনে ঢুকেছিল সংশয়ের ঘুণপোকা। হারিয়ে খুঁজছিলেন নিজেকে। এবার দেশ ছাড়ার আগে ঠিক করেছিলেন, এই ভয়কে জয় করবেন। ত্রিদেশীয় সিরিজে রান করার চেয়েও সৌম্য সরকারের বড় তৃপ্তি, নিজের সঙ্গে সেই লড়াইয়ে জয়।

“এখন আমার হারানোর আর ভয় নাই। আয়ারল্যান্ডে আসার আগে ভেবেছি, অনেক হয়েছে। আর এসব ভেবে লাভ নেই”, ত্রিদেশীয় সিরিজের পর  বলছিলেন বাংলাদেশের প্রথম শিরোপা জয়ের অন্যতম নায়ক সৌম্য।

আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রতিটি ম্যাচে ম্যান অব দা ম্যাচের পুরস্কারের পাশাপাশি আরেকটি স্বীকৃতি ছিল, ‘ফাউন্ডেশন অব দা ম্যাচ।’ ম্যান অব দা সিরিজের মতো যদি ‘ফাউন্ডেশন অব দা সিরিজ’ থাকত, তাহলে সেই পুরস্কারের জোর দাবিদার হতেন সৌম্য। বাংলাদেশের শিরোপার ভিত তো তার ব্যাটেই গড়া!

ফাইনালে বাংলাদেশের কঠিন রান তাড়া সহজ করে দিয়েছিল সৌম্যর ৪১ বলে ৬৬ রানের ইনিংস। ফাইনালে ওঠার পথেও বাংলাদেশের দুটি জয়ে সুর বেঁধে দিয়েছিল তার ব্যাট। করেছিলেন ৬৮ বলে ৭৩ ও ৬৭ বলে ৫৪। তার ৪৪ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে টানা তিন ইনিংসে পঞ্চাশ ছোঁয়া হলো এই প্রথমবার।

রান-বলের পরিসংখ্যানের চেয়েও চোখে পড়ার মতো ছিল ব্যাটিংয়ের ধরন – একইসঙ্গে নান্দনিক ও বিধ্বংসী ব্যাটিং। যতক্ষণ উইকেটে ছিলেন, তার ব্যাটিং ছড়িয়েছে মুগ্ধতা, গুঁড়িয়েছে বোলারদের। কখনও ফ্লিক বা ড্রাইভ, কখনও দাপুটে পুল বা লফটেড শট। সৌম্য ফিরেছেন আপন রূপে।

এমন নয় যে নিজের সেই রূপ এই সিরিজের আগে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবে হতে পারছিলেন না ধারাবাহিক। এই টুর্নামেন্টের আগে নিউ জিল্যান্ড সফরে দলের হতাশার সিরিজে দুটি ওয়ানডেতে ভালো শুরু করেছিলেন। কিন্তু ভালো ইনিংসে রূপ দিতে পারেননি। নেপিয়ারে থেমেছেন ২২ বলে ৩০ করে, ক্রাইস্টচার্চে ২৩ বলে ২২।

তার আগে দেশের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের শেষ ম্যাচে তিনে নেমে ৫টি করে চার ও ছক্কায় করেন ৮০ রান। ওই সিরিজের আগে দুই ম্যাচে ছয় ও সাতে নেমে করেছিলেন ১৯ ও ৬। তবে সেই সিরিজের আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে দলে ফিরে তিনে নেমে খেলেছিলেন ৯২ বলে ১১৭ রানের ইনিংস।

‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই…’ ব্যাপারটিতে বিরক্ত হয়ে উঠছিলেন সৌম্য নিজেও। তার ঘরানার ব্যাটসম্যানের সবচেয়ে বড় শক্তি দ্বিধাহীন চিত্তে নিজের ওপর আস্থা রেখে খেলে যাওয়া। প্রবল মানসিক শক্তি এই ধরনের ব্যাটসম্যানদের সবচেয়ে বড় খুঁটি। কিন্তু সৌম্য উপলব্ধি করতে পারছিলেন, সেই খুঁটি নড়বড়ে লাগছে। এবার বিশ্বকাপ অভিযানে আসার আগে তাই নিজের সঙ্গে বেশ বোঝাপড়া করে এসেছেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।

“চারপাশের কথা হয়তো আমার মনে প্রভাব ফেলছিল। সেটির প্রভাব পড়ছিল ব্যাটিংয়ে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গত কিছুদিনে একদম খারাপ করিনি মনে হয়। নিউ জিল্যান্ডে তো টেস্টে সেঞ্চুরি হলো। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে যেটিতে টপ অর্ডারে সুযোগ পেয়েছিলাম, রান করেছিলাম। কিন্তু ঢাকা লিগে বেশ কিছু ম্যাচে রান না পাওয়ায় অনেক কথা হচ্ছিল।”

“আমি চেষ্টা করছিলাম। প্র্যাকটিসে তো কমতি রাখিনি। তবু হচ্ছিল না। ক্রিকেটারদের এ রকম হয়। লোকজনের কথাও খারাপ লাগছিল। পরে ঠিক করলাম, নেতিবাচক সব কথাও ভাবনা থেকে নিজেকে দূরে রাখব। অনেক হারিয়েছি ওসব ভেবে। আর হারানোর ভয় করে লাভ নেই। পরে ঢাকা লিগে খেলেছি খোলা মনে। সেখানে সেঞ্চুরি ও ডাবল সেঞ্চুরি আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে সাহায্য করেছে।”

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে এবার শুরু থেকে তেমন কিছু করতে না পারলেও তাকে খেলিয়ে গেছে আবাহনী। ফল মিলেছে শেষ দুই ম্যাচে। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে দেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি উপহার দিয়েছেন শেষ ম্যাচে, তার আগের ম্যাচে করেছেন সেঞ্চুরি। এরপর এলো আয়ারল্যান্ডে এই টুর্নামেন্টের সাফল্য।

শুধু বাইরের কথাকে বাইরে রাখাতেই নয়, মানসিকতার বদলের ছোঁয়া লেগেছে ব্যাটিংয়ের আরও নানা দিকে।

“ফাইনালে খেয়াল করে দেখবেন, বোলার টার্গেট করে খেলেছি। উইকেটে যাওয়ার পর ওদের বোলিং যখন শুরু হলো, মনে হলো কেমার রোচ খুব ভালো করছে না। সে একটু জোরে বল করে, ব্যাটে আসে। তাকে টার্গেট করেছিলাম। গ্যাব্রিয়েলও জোরে বল করে, ব্যাটে আসে বল। ওকেও ভালো খেলছিলাম। তবে দুটি উইকেট নেওয়ার পর মনে হলো তাকে সাবধানে খেলতে হবে।”

“এছাড়াও দুই বাঁহাতি দেখে অফ স্পিনার নার্সকে দিয়ে শুরু করেছিল। ঠিক করেছিলাম ওকে চেপে বসতে দেওয়া যাবে না। এভাবে বোলার পিক করা জরুরি, আমার মনে হয়েছে। তার মানে, এক বোলারকেই মারতে হবে, তা নয়। তবে রান স্কোরিংয়ের অপশন বের করতে হবে। এই টুর্নামেন্টে এভাবে ভেবে খেলেছি।”

এই টুর্নামেন্টের সাফল্যে উচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছেন না সৌম্য। জানেন, হ্যাটট্রিক ফিফটি যেমন সাফল্য, একটিকেও তিন অঙ্কে রূপ দিতে না পারা একটি ব্যর্থতাও। নিজের ক্যারিয়ার থেকেই জানেন, খারাপ সময় কেবলই একটি-দুটি ইনিংস দূরে! ঝড়ো হাওয়ার ঝাপটায় আবার নড়ে যেতে পারে ভিত। গত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগেও আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে ভালো করেছিলেন। কিন্তু মূল টুর্নামেন্টে গিয়ে ছিলেন বিবর্ণ।

সৌম্য এবার তাই সাবধানী। টুর্নোমেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও তেমন কোনো উদযাপনই দেখা যায়নি। ব্যর্থতা-সাফল্য, চাইছেন সবই স্বাভাবিকভাবে নেওয়াটা শিখতে।

“অন্তত একটি সেঞ্চুরি হওয়া উচিত ছিল। চেষ্টা করব আবার সুযোগ এলে কাজে লাগাতে। তবে জানি, সামনে যে কোনো কিছুই হতে পারে। সব আমার হাতে নেই, ভেবেও লাভ নেই। আমি শুধু চেষ্টা করব নিজের কাজ করে যেতে। ভালো করলে প্রশংসা আসবে, খারাপ করলে কথা শুনতে হবে। কিন্তু আমার কাজটা আমাকেই করতে হবে। আমি সেটিই মন দিয়ে করতে চাই।”01-

Share.

Leave A Reply