১০ বছর ধরে শেকলে বন্দি বৃষ্টির কান্না দেখার কেউ নেই

0

শাহীন রহমান : ‘‘গলা থেকে পা পর্যন্ত শেকল দিয়ে পেচানো। আর শেকলের সাথে লাগানো হয়েছে দু’টি তালা। সেই শেকল বাঁধা ভাঙ্গাচোরা ঘরের বাঁশের খুঁটির সাথে। এভাবেই জীবনের দশটি বছর কেটে গেছে মানসিক প্রতিবন্ধী বৃষ্টি’র (১৫)। পুরো নাম শুকজান নেছা।’’

তার বাড়ি চাটমোহর উপজেলার নিমাইচড়া ইউনিয়নের ধানকুনিয়া সরকারপাড়া গ্রামে। জন্মের পর মারা যান মা রোজিনা খাতুন। বাবা মনিরুল ইসলাম আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র চলে যান। কোন জায়গায় ঠাঁই হয় না বৃষ্টির। অবশেষে শতবর্ষী বুড়া মা (মায়ের দাদী) রাহেলা বেগমের কাছে আশ্রয় মেলে তার। ভাঙ্গাচোরা ঘরে দিনরাত শেকল বন্দি হয়ে থাকতে হয় বৃষ্টিকে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি ঝুঁপড়ি ঘরে বুড়া মা’র সঙ্গে আনমনা বসে আছে বৃষ্টি। পড়নে ছেঁড়া কাপড়। বাঁশের খুঁটির সাথে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে। শেকলের ভারে ঘাড় শক্ত হয়ে গেছে। তবুও নেই কোন অনুভূতি। কথা বলার জন্য কাছে গেলে বৃষ্টি বলে ওঠে, ‘মাথা শট, মাদ্রাজ যাব, চিকিৎসা করাবো। ব্রেনের চিকিৎসা করাবো।’

বছর চারেক আগে ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আল মামুন বৃষ্টিকে প্রতিবন্ধী ভাতা এবং রাহেলা বেগমকে একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দিয়েছিলেন। সেই ভাতার টাকা দিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে নিদারুণ কষ্টে দিন কাটে বৃষ্টি ও রাহেলা বেগমের। বয়সের ভারে ন্যুজ্ব বুড়া মা রাহেলা বেগম টাকার অভাবে বৃষ্টি’র চিকিৎসা করাতে পারেননি। এদিকে রাহেলা বেগমের ছেলেদের এ ব্যাপারে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। ভাতার টাকা তাদের কাছে দিলে মেলে খাবার, নয়তো না খেয়েই থাকতে হয়। তবে চিকিৎসা করালে বৃষ্টি ভাল হতে পারে বলে ধারণা প্রতিবেশীদের।

কথা হয় রাহেলা বেগমের সাথে। জানান, পাঁচ বছর বয়স থেকে তার (বৃষ্টি) পাগলাটে ভাব শুরু হয়। মাঝে মধ্যেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যেত। তাকে কেন্দ্র করে পাড়া প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ লেগে থাকতো। অন্যের বাড়ির জিনিসপত্র নষ্ট করা শুরু করে। এছাড়া মাঝে মধ্যে হারিয়ে যেত। কোন উপায় না পেয়ে ভয়ে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে বৃষ্টিকে। রাহেলা বেগম বলেন, ‘মাঝে মধ্যে বৃষ্টি মায়ের কাছে যাবো বলে আবদার করে। কিন্তু ওর মা তো পৃথিবীতে নাই! আমি মরে গেলে ওকে দেখবে কে?’

ধানকুনিয়া গ্রামের শিক্ষক এসএম ফিরোজুর রহমান বলেন, শেকল দিয়ে বেঁধে রাখার বিষয়টি অমানবিক দেখালেও একজন বৃদ্ধ মানুষের পক্ষে মানসিক প্রতিবন্ধী বৃষ্টিকে আটকে রাখা অসম্ভব। চিকিৎসা করালে মেয়েটি হয়তো ভাল হতে পারে। কিন্তু তাদের সামর্থ্য নেই। রাহেলা বেগমের ছেলেরা নিজেদেরকে নিয়েই ব্যস্ত। বৃষ্টি ও রাহেলা বেগমের জন্য সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরকার অসীম কুমার বলেন, ‘১০ বছর ধরে একটি মেয়েকে শেকলে বাঁধা অবস্থায় রয়েছে, এটা খুবই দুঃখজনক। হোক সে মানসিক প্রতিবন্ধী। আমি খোঁজ নিয়ে অবশ্যই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবো এবং পরিবারটির পাশে দাঁড়াবো।’

Share.

Leave A Reply