“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে”

0

আঁখিনূর ইসলাম রেমন

১৭৭৪ সালে লালনের জন্ম বাংলার এক কৃষক পরিবারে, বর্তমানে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ছেউড়িয়া গ্রামে ?

মানবতার কবি লালন ১৮৯০ সালের ১৬ অক্টোবর ইহলোক ত্যাগ করেন। তার বাল্য কৈশোর ও শিক্ষাজীবন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। মতান্তরে তিনি নাকি বেঁচেছিলেন ১১৬ বছর। তাতে বলা যায় তিনি দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন।

সাধক লালন যে যুগে বড় হয়ে উঠেছিলেন সে যুগ ছিল পরাধীনতার যুগ। সে সময় বাংলার শাসনভার ছিল ব্রিটিশের ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে। তখন ইংরেজদের শাসন শোষণ ও নির্যাতনে গ্রামীণ সমাজ জীবন ছিল সংকটাপন্ন।

জন্মের পর বড় হতে না হতেই চোখ খুলে তাকাতেই লালন দেখেছিলেন দেশ জুড়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ছবি। ইতিহাসে যা বাংলার ছিয়াত্তরের (বাংলা ১৭৭৬) মহা দুর্ভিক্ষ।

মানব সৃষ্ট মহা খাদ্য সংকট এই দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী ছিল ইংরেজ বণিক শাসকদের লুন্ঠন ও নির্যাতন। তাই গভীর দুঃশাসন ও দুর্ভিক্ষের এক অসহনীয় পরিবেশের মধ্যে কেটেছে লালনের শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের দিনগুলো।

মরমি কবি লালন প্রাতিষ্ঠানিক কোন লেখাপড়া করার সুযোগ পাননি। কিন্তু তিনি বড় বড় স্বশিক্ষিত পন্ডিতদের মতো পৃথিবী নামক পাঠশালায় স্বশিক্ষিত হয়ে উঠেন।

তার সাধন ভজনের পীঠস্থান ছিল ছেউড়িয়া গ্রাম। পরবর্তীকালে এই ছেউড়িয়া বাংলার মানুষের কাছে তীর্থ স্থানে পরিণত হয়।

বর্তমানে লালনের চিন্তাদর্শ ও ছেউড়িয়া গ্রাম অপরিসীম কৌতুহল ও বিস্ময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে লালন ভক্তদের মাঝে। তাইতো পৃথিবীর ক্ষমতাধর বিভিন্ন দেশের গবেষক, অধ্যাপক আর গুনীজনরা ছুটে আসছেন কুমার খালীর ছেউড়িয়া গ্রামে।

জীবিতকালে এই ফকির লালনই তার জীবন ও কর্মসাধনা দিয়ে মহিত করেছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর পরিবারকে (১৮১৭-১৮৮৫)। তাইতো জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সরলাদেবীসহ ঠাকুর পরিবারের কিছু সদস্য লালনকে জানার জন্য উৎসুক হয়ে উঠেছিলেন।

লালনের সাধন ভজন ও তার প্রবল মানবতাবাদী জীবন দর্শনের উৎসমূলে ভক্তগণ দুটি কারণকে শনাক্ত করতে পারে।

মতান্তরে জানা যায় তার আনুমানিক বয়স যখন তিরিশের কোঠায় তখন গ্রামের কিছু যুবকের সাথে তিনি নদীয়া কিংবা মূর্শিদাবাদের দিকে যাত্রা করেন। পথে মারাত্বকভাবে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। মূর্মূষ অবস্থায় সঙ্গীরা তাকে নদী পাড়ে ফেলে রেখে চলে যায়। ভাগ্য ক্রমে মুসলিম তাঁতি পরিবারের এক মহিলা ঘাটে এসে তাকে দেখতে পান এবং তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান।

সেই মাহিলার অশেষ সেবা ও মমতায় লালন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং একদিন নিজ বাড়ীর দিকে যাত্রা করেন। এ দিকে লালনের পরিবারের সবাই ধরেই নিয়েছিলো সে মারা গেছে। কিন্তু লালন যখন সশরীরে উপস্থিত হলেন তখন তার পরিবারের সবাই বিস্মিত হয়ে উঠে। কিন্তু ঘটনার বর্ণনা ক্রমে যখন পরিবারের লোকেরা জানতে পারে যে লালন মুসলিম পরিবারের সেবা যতœ পেয়েছে এবং তাদের রান্না খেয়েছে, তখন তারা লালনকে বর্জন করেন এবং তাকে জাতিচ্যুত করা হয়।

তবে বিভিন্ন লেখালেখি এবং লালন গবেষকদের উদ্ধৃতিতে জানা যায় গুরু লালন যে, মুসলিম তাঁতী পরিবারে আশ্রয় পেয়েছিলেন এবং যে নারীর সেবায় তিনি আরোগ্য লাভ করে ছিলেন, সেই নারীর পিতা একদিন মেয়েকে ক্ষোভের সাথে “বলেছিলেন” মা, তুই কার সেবা করছিস? গ্রামের মানুষ কানাগুষা করছে সে হিন্দু না মুসলমান? মেয়েটি তখন পিতাকে খুব সহজ সরল ভাবে উত্তর দিয়েছিলো, আমি ভালো করে জানি সে কোন জাত, কারণ অসুস্থ অবস্থায় আমি তার কাপড় বদলিয়েছি। পিতা তখন মেয়ের কাছে আর কোন জবাব চাননি।

মহাতœা লালন প্রয়াত হবার ১৪ দিন পর অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর ১৮৯০ তারিখে “মীর মোশাররফ হোসেন সম্পাদিত পাক্ষিক “হিতকরী” পত্রিকায় মহাতœা লালন ফকির শিরোনামে একটি উপ সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। নিবন্ধটি লালনের জীবন কর্ম ও কীর্তির মূল্যায়নের বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসাবে স্বীকৃত। উপ-সম্পাদকীয় বা নিবন্ধের কয়েকটি লাইন তুলে ধরা হল।

“লালন ফকিরের নাম এ অঞ্চলে কাহারো

শুনিতে বাকি নাই। শুনিতে পাই ইহার শিষ্য

দশ হাজারের উপরে।

ইহাকে আমরা স্বচক্ষে দেখিয়াছি: আলাপ

করিয়া বড়ই প্রীতি হইয়াছি।

মিথ্যা জুয়াচুরিকে লালন ফকির বড়ই ঘৃণা করিতেন।

তিনি কোন শাস্ত্র পড়েন নাই: কিন্তু ধর্মালাপে তাহাকে বিলক্ষন শাস্ত্রবিদ বলিয়া বোধ হইত।

লালন নিজে কোন সম্প্রদায়িক ধর্মাবলম্বী

ছিলেন না, অথচ সকল ধর্মের লোকই তাহাকে

আপন বলিয়া জানিত।

জাতিভেদ মানিতেন না। ইনি বড় গুরুবাদ পোষণ করিতেন।

ইহার শিষ্যগণ ইহার উপাসনা ব্যতীত আর কাহারও

উপাসনা শ্রেষ্ঠ বলিয়া মানিতেন না।

ইনি নামাজ পড়িতেন না। সুতরাং মুসলমান

কি প্রকারে বলা যায়?  তিনি একজন পরম ধার্মিক ও সাধু ছিলেন, তৎসন্মন্ধে কাহারও মতদ্বৈত নাই। ইহার জীবন লিখিবার উপকরণ পাওয়া কঠিন, ইহার কোন আত্মীয় জীবিত নাই।

সাধারণে প্রকাশ লালন ফকির জাতিতে কায়স্থ ছিলেন। ইনি নাকি তীর্থ গমন কালে পথে বসপ্তরোগে আক্রান্ত হইয়া সঙ্গীগণ কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়ে ছিলেন। মূমূর্ষ অবস্থায় একটি মুসলমানের দয়া ও সেবায় জীবন লাভ করিয়া ফকির হয়েছিলেন।

ইনি ১১৬ বৎসর বয়সে গত ১৬ অক্টোবর ১৮৯০ খ্রিঃ শুক্রবার প্রাতে মানবলীলা সম্বরণ করিয়াছেন। অনেক সম্প্রদায়ের লোক ইহার সহিত ধর্মালাপ করিয়া তৃপ্ত হইতেন।

মৃত্যুকালে কোন সম্প্রদায়ী মতানুসারে তাহার অন্তিÍম কার্য্য সম্পন্ন হওয়া তাহার অভিপ্রায় ও উপদেশ ছিল না। এজন্য মোল্লা বা পুরোহিত কিছুই লাগে নাই। তাহারই উপদেশ অনুসারে আখড়ার মধ্যে একটি ঘরের ভিতর তাহার সমাধি হইয়াছে। লালন ফকিরের অসংখ্য গান সর্বত্র গীত হইয়া থাকে। তাহাতেই তাহার নাম, ধর্ম ও বিশ্বাস সুপ্রচারিত হইবে।’7928028_orig

Share.

Leave A Reply