উত্তরাঞ্চলের চাষিদের প্রতি মণ আমনে লোকসান হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা

0

শফিউল আযম : উত্তরাঞ্চলে আমন ধানের বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে হাসি নেই। প্রতিমন ধানে উৎপাদন খরচ পড়েছে ৮০০ টাকা। শ্রমে-ঘামে ফলানো সেই ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতিমন ৬০০-৭০০ টাকা দরে। প্রতিমন ধানে কৃষককে লোকসান দিতে হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এর বিরুপ প্রভাব পড়ছে গ্রামীন অর্থনীতিতে। মওসুমের শুরুতে আমন ধানের দরপতনে এ অঞ্চলের কয়েক লাখ কৃষক পরিবারের নবান্নের উৎসবকে ম্লান করে দিয়েছে।

রাজশাহী ও রংপুর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, চাপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলায় এবার প্রায় ১৮ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে ব্রি-ধান-৩৩, ৩২ বিআর-১১, ব্রি ধান-৪৯, বিনা-৭, বিনা-৮, বিনা-৪, বিনা-১০, লাল পাইজাম, কালা পাইজাম, স্বর্ণা, ধানী গোল্ড, স্বর্ণা নেপালী, লেমবু ও বিন্নি জাতের ধানের আবাদ হয়েছে। হেক্টর প্রতি ধানের ফলন চার দশমিক ৫ ও চালের ফলন দুই দশমিক ৭ মেট্রিক টন ধরা হয়। সে হিসেবে এবছর উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় ৮১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টন ধান ও ৪৯ লাখ ৫০০ টন চাল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ অঞ্চলে এখন পুরোদমে ধান কাটা, মাড়াই ও ঝাড়াইয়ের কাজ চলছে। অনুকুল আবহাওয়ায় এ অঞ্চলে ব্রি ধান-৩৩, ব্রি-৩৯, বিনা ধান-৭ ও স্বর্ণা নেপালী ধানে বেশি ফলন হয়েছে। ব্রি ধান-৩৩, ৪৯ বিনা ধান-৭ এর বেশি ফলন হয়েছে। ব্রি ধান-৩৩, ৪৯ প্রতি হেক্টরে পাঁচ দশমিক ৫ টনে তিন দশমিক ৭ টন চাল এবং বিনা ধান-৭,৪,৯ ও স্বর্ণা নেপালী প্রতি হেক্টরে তিন দশমিক নয় টন চাল উৎপাদন হয়েছে বলে কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া গ্রামের কৃষক ঈমান আলী জানান, চলতি আমন মওসুমে জমি প্রস্তÍুত করা থেকে শুরু করে ধান কাটা, পরিবহন মাড়াইসহ ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতিমন ধানে উৎপাদন খরচ পড়েছে প্রায় ৮০০ টাকা। সেই ধান হাট-বাজারে প্রতিমন বিক্রি হচ্ছে প্রকার ভেদে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। প্রতিমনে লোকসান হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। আগাম দাদন নিয়ে ধান আবাদ করায় টাকা পরিশোধের তাগাদায় প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক লোকসান দিয়েই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

আতাইকুলা, বনগ্রাম, কাশিনাথপুর, সিঅ্যান্ডবি চতুরহাটে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের আমন ধানের বাজার দর কম হওয়ায় কৃষকদের মাঝে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা। এ অঞ্চলের প্রধান প্রধান হাটগুলোতে নিয়মিত যাতায়াত করেন এমন ব্যাপারিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৫ দিনের ব্যবধানে হাট-বাজারে আমন ধান চিকন ও মোটা প্রকারভেদে প্রতিমনে ১০০ টাকা কমে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকেরা প্রতিমন আমন ধানে লোকসান দিচ্ছেন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার ফলে দরিদ্র কৃষকের দিন কাটছে কষ্টে। এদিকে ধানের দাম কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে চালের দামে কোন প্রভাব পড়ছে না। ফলে খুচরা বাজারে কমছে না চালের দাম।

কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কৃষি উপকরণসহ শ্রমের দাম যে হারে বাড়ছে সে হারে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের দাম বাড়ছে না। এর পেছনে তারা সরকারের অভ্যন্তরীণ বাজারনীতিকে দায়ী করেছেন। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ কৃষকই দরিদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষি পর্যায়ের। তারা ঋণ করে ফসল উৎপাদন করেন। ফসল ওঠার সাথে সাথে বিক্রি করে দেনা শোধ করতে হয়। মওসুমি ফসল ওঠার সাথে সাথে তাদের একযোগে ফসল বিক্রির জন্য বাজারে আনতে বাধ্য হন। সরকারের সঠিক ক্রয়নীতি না থাকায় এ সময় বাজার নিয়ন্ত্রন করে এক শ্রেনীর ফড়িয়া, চালকাল মালিক ও মজুতদারেরা। কৃষকের গোলাশুন্য হলে কৃষিজ পণ্যের দাম বাড়ে। আর এ দামের সুবিধা পায় মজুতদার ও ফড়িয়া, বঞ্চিত হন কৃষক।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বাড়াবিল গ্রামের কৃষক আজিজ মোল্লা বলেন, আমন ধানের দরপতনে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারা ধান হাটে নিয়ে পানির দারে বিক্রি করছেন। কৃষকের কাছে কোন বিকল্প না থাকায় তারা বাধ্য হয়েই আবার মাঠে নামছেন বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনের জন্য। পোঁতাজিয়া গ্রামের কৃষক হাজি মোতালেব মিয়া বলেন, বাজারে ধানের কোন চাহিদা নেই। কৃষকের হাতে যখন ধান থাকবে না তখন দাম বাড়বে। সেই দাম বাড়া কৃষকের কোন উপকারে আসবে না বলে তিনি জানান।

বেড়া উপজেলার পায়না গ্রামের কৃষক মান্নান মোল্লা নিজের জমিতে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা মজুরি শ্রমিক দিয়ে কৃষি জমিতে ধান পাট চাষ করেন। বছর শেষে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে তিনি হিসাব করে দেখন তার লাভ তো দুরের কথা উৎপাদন খরচই উঠতে চায় না। মূলত ধানের বাজার নিয়ন্ত্রন করছে চালকল মালিক, মধ্যস্বত্তভোগী ও মজুতদারেরা। ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক। এ বছর প্রতি কেজি আমন ধান উৎপাদনে খরচ পড়েছে ২০ টাকা। সেই হিসাবে প্রতিমন ধান (৪০ কেজি) উৎপাদনে খরচ পড়েছে ৮০০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে হাট-বাজারে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মণ দরে ধান বেচাকেনা হচ্ছে। ধান বিক্রি করে প্রতিমণে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা গ্রামের কৃষক আজাহার আলী নিজের জমিতে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা মজুরি দিয়ে শ্রমিক খাটিয়ে বোরো, পাট ও আমন ধান আবাদ করেন। বছর শেষে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে তিনি হিসাব করে দেখেন তার লাভতো দুরের কথা, উৎপাদন খরচই ওঠছে না। শুধু তিনিই নন, উত্তরাঞ্চলের লাখ লাখ কৃষকের অবস্থা একই রকম। কয়েক বছর ধরে কৃষি উপকরণের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি ও কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষি অলাভজনক পেশায় পরিনত হয়েছে। এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে গ্রামীন অর্থনীতিতে। প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা কৃষি পেশায় টিকতে না পেরে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

রাজশাহী ও রংপুর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলে মোট কৃষি পরিবারের সংখ্যা ৫৫ লাখ ৭৩ হাজা ৮৮টি। রাজশাহী বিভাগে ২৯ লাখ ৯৮ হাজার ৩৬৫টি এবং রংপুর বিভাগে ২৫ লাখ ৭৫ হাজার ৫১৬টি। এর মধ্যে ভূমিহীন কৃষি পরিবার ১৬ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮৭টি, প্রান্তিক চাষি পরিবার ২০ লাখ ৭৫ হাজার ৫১৬টি, ক্ষুদ্র চাষি পরিবার ১০ লাখ ৫৫ হাজার ৩২২টি, মাঝারি চাষি পরিবার ছয় লাখ ৫৫ হাজার ৬৬৬টি ও বড় কৃষি পরিবার এক লাখ ৫২ হাজার ৫৭৫টি। বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরে বিভিন্ন স্তরের কৃষক পরিবারের পরিসংখ্যান থাকলেও বর্গচাষি পরিবারের কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে উত্তরাঞ্চলে বর্গাচাষি পরিবারের সংখ্যা আট লাখ ২৯ হাজার ৭৫৭টি। উৎপাদিত কৃষি পণ্যের দাম কম হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রন্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষি।

উত্তরাঞ্চলের আমন ধানের দরপতনে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রভাব পড়েছে গ্রামীন অর্থনীতিতে। এ অঞ্চলের গ্রামীন অর্থনীতিতে চরম মন্দা ভাব বিরাজ করছে। ঋণের জালে আটকে যাচ্ছেন কৃষক। ব্যাংকঋণ সহজলভ্য না হওয়ায় বেশির ভাগ কৃষক চড়া সুদে দাদন নিয়ে আসন্ন বোরো আবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ এলাকার ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বর্গাচাষিরা কৃষি পেশা ছেড়ে বেছে নিচ্ছেন অন্য পেশা।

Share.

Leave A Reply